তিনটি জামা: সূরা ইউসুফের একটি গভীর শিক্ষা

কালো পৃষ্ঠে কালো, ধূসর ও বাদামি তিনটি ভি-নেক জামা

Photo by Mnz on Unsplash

সূরা ইউসুফে মোট তিনবার “জামা” (কামীছ)-এর উল্লেখ এসেছে। কুরআনে কোনো শব্দের পুনরাবৃত্তি কখনো নিরর্থক নয় -​ প্রতিটি জামার পেছনে লুকিয়ে আছে জীবনের এক একটি গভীর শিক্ষা।

১. প্রথম জামা -​ বিপদের সূচনা

ইউসুফ (আঃ)-কে কুপে নিক্ষেপ করার পর তাঁর ভাইয়েরা পিতা ইয়াকুব (আঃ)-এর কাছে মিথ্যা রক্ত মাখানো জামা নিয়ে আসে, দাবি করে যে নেকড়ে তাঁকে খেয়ে ফেলেছে (সূরা ইউসুফ, ১২:১৭-১৮)। এই জামাই ছিল ইউসুফ (আঃ)-এর জীবনে কষ্টের প্রথম অধ্যায়ের সূচনা। আপন ভাইদের বিশ্বাসঘাতকতা, পিতার থেকে বিচ্ছিন্নতা, কূপের অন্ধকার -​ জীবনের প্রতিটি কঠিন যাত্রারই একটি শুরু থাকে, আর এই জামা ছিল সেই শুরুর প্রতীক।

কিন্তু সব বিপদই মানুষের জন্য অকল্যাণ বয়ে আনে না। বরং যে বিপদ মানুষকে ধৈর্য ধরতে শেখায় ও তার রবের কাছে নিয়ে আসে তা ওই ব্যক্তির জন্য কল্যাণকরই।

فَصَبْرٌ جَمِيلٌ ۖ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَىٰ مَا تَصِفُونَ
“সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই উত্তম, আর তোমরা যা বর্ণনা করছ সে বিষয়ে আল্লাহই একমাত্র সাহায্যস্থল।” (সূরা ইউসুফ, ১২:১৮)

২. দ্বিতীয় জামা -​ সঠিক পথে থাকাও পরীক্ষামুক্ত করে না

মিসরে আযীযের ঘরে ইউসুফ (আঃ) যখন কঠিন ফিতনার সম্মুখীন হন, তিনি পাপ থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কুরআন স্পষ্ট করে বলে, আল্লাহর প্রমাণ (বুরহান) তাঁকে না দেখালে তিনিও হয়তো প্রবৃত্তির দিকে ঝুঁকে পড়তে পারতেন (সূরা ইউসুফ, ১২:২৪) -​ অর্থাৎ এই হেফাজত তাঁর নিজের শক্তিতে নয়, বরং আল্লাহর বিশেষ রহমতেই হয়েছিল। পালানোর সময় তাঁর জামা পেছন থেকে ছিঁড়ে যায় (সূরা ইউসুফ, ১২:২৫-২৮)। লক্ষ্য করুন -​ ইউসুফ (আঃ) তখন সম্পূর্ণ সঠিক পথে ছিলেন, তবুও তাঁকে কঠিনতম পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এমনকি তিনি নিজেই পাপের চেয়ে কারাগারকে অধিক পছন্দনীয় মনে করে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন (সূরা ইউসুফ, ১২:৩৩), আর শেষ পর্যন্ত তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল (সূরা ইউসুফ, ১২:৩৫)।

رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ
“হে আমার রব, তারা আমাকে যেদিকে ডাকছে তার চেয়ে কারাগারই আমার কাছে অধিক প্রিয়।” (সূরা ইউসুফ, ১২:৩৩)

আর কারাগারে থাকা অবস্থাতেও তাঁর পরীক্ষা থামেনি। যে বন্দীর স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছিলেন, তাকে বলেছিলেন, “তুমি মুক্তি পেলে তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা উল্লেখ কোরো” -​ কিন্তু শয়তান তাকে ভুলিয়ে দেয়, ফলে সে রাজার কাছে ইউসুফ (আঃ)-এর কথা উল্লেখ করতেই ভুলে যায় (সূরা ইউসুফ, ১২:৪২)। (এই আয়াতের একটি ব্যাখ্যায় কিছু মুফাসসির বলেছেন, এক সৃষ্টির ওপর এই সাময়িক ভরসার কারণেই হয়তো কারাবাস দীর্ঘায়িত হয়েছিল; তবে অধিকাংশের মত হলো, ভুলে গিয়েছিল সেই বন্দী নিজে।) ফলে ইউসুফ (আঃ)-কে আরও কয়েক বছর কারাগারে কাটাতে হয়।

এটাই বাস্তবতা -​ যখন আপনি কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যান, তখন একের পর এক জিনিস যেন ভুল হতেই থাকে। যার ওপর ভরসা করেছিলেন, সেটাও হয়তো কাজ করবে না।

এখান থেকে শিক্ষা হলো: তাকওয়ার পথে থাকা মানেই পরীক্ষা থেকে মুক্তি নয়; বরং পরীক্ষা চলতেই থাকতে পারে, একটার পর একটা।

তবু আল্লাহ বলেন, তিনি কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত পরীক্ষায় ফেলেন না (সূরা বাকারা, ২:২৮৬)। পরীক্ষা যত দীর্ঘই হোক, তা ঠিক ততটুকু, যতটুকু বহন করার সাধ্য আল্লাহ আপনাকে দিয়েছেন।

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।” (সূরা বাকারা, ২:২৮৬)

৩. তৃতীয় জামা -​ মেঘের আড়ালে সূর্য

বছরের পর বছর কান্নায় ইয়াকুব (আঃ)-এর দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে যায়। অবশেষে যখন ইউসুফ (আঃ) মিসরের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হলেন, তিনি তাঁর জামা পাঠিয়ে দিলেন পিতার মুখমণ্ডলে রাখার জন্য, আর তা স্পর্শ করা মাত্র ইয়াকুব (আঃ) পুনরায় দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেন (সূরা ইউসুফ, ১২:৯৩-৯৬)।

فَلَمَّا أَن جَاءَ الْبَشِيرُ أَلْقَاهُ عَلَىٰ وَجْهِهِ فَارْتَدَّ بَصِيرًا
“অতঃপর যখন সুসংবাদদাতা এল, সে জামাটি তাঁর মুখমণ্ডলে রাখল, আর তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেন।” (সূরা ইউসুফ, ১২:৯৬)

কিন্তু আসল আনন্দটা এরপরেই আসে। ইয়াকুব (আঃ) ও তাঁর পুরো পরিবার মিসরে এসে ইউসুফ (আঃ)-এর সাথে পুনরায় মিলিত হন।​ বহু বছরের বিচ্ছেদের পর পিতা-পুত্র একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন, আর ইউসুফ (আঃ)-এর ছোটবেলায় দেখা সেই স্বপ্ন -​ এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্র তাঁকে সিজদা করছে -​ পূর্ণতা পায় (সূরা ইউসুফ, ১২:৯৯-১০০)। (এই সিজদা ছিল সম্মানসূচক, সে যুগের শরীয়তে এটি প্রচলিত ও বৈধ ছিল; ইসলামে সিজদা একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত।)

هَٰذَا تَأْوِيلُ رُؤْيَايَ مِن قَبْلُ قَدْ جَعَلَهَا رَبِّي حَقًّا
“এটাই আমার আগের স্বপ্নের ব্যাখ্যা, আমার রব একে সত্যে পরিণত করেছেন।” (সূরা ইউসুফ, ১২:১০০)

এই পুনর্মিলনই হলো সেই সূর্য, যা মেঘের আড়ালে সবসময় ছিল। কষ্টের শুরুতে যে পরিবার ভেঙে গিয়েছিল, বছরের পর বছরের ধৈর্য আর পরীক্ষার শেষে সেই পরিবারই আবার একত্রিত হয়।

তাই বলা যায় -​ সবরের শেষ প্রান্তে যে স্বস্তি আসে, তা শুধু কথার কথা নয়; তা বাস্তব এবং তা আসবেই।

উপসংহার

এই তিনটি জামা যেন আমাদের জীবনের তিনটি পর্যায়ের প্রতিচ্ছবি -​ কষ্টের শুরু, পরীক্ষার মধ্য দিয়ে দৃঢ়তা, আর অবশেষে আল্লাহর রহমতে স্বস্তি ও পুনর্মিলন। ইউসুফ (আঃ)-এর জীবন আমাদের শিখিয়ে দেয় -​ সবরের সাথে আল্লাহর উপর ভরসা রাখলে, প্রতিটি অন্ধকার রাতের পরেই আসে আলোকিত সকাল।

اللّٰهُمَّ اجْعَلْنَا مِنَ الصَّابِرِينَ
হে আল্লাহ, আমাদের ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন